আগে মূল পণ্য (ফিজিক্যাল কমোডিটি) নিয়ে কাজ করত না হেজ ফান্ড ও ট্রেডিং ফার্মগুলো। তাদের বিনিয়োগের ক্ষেত্র হলো বিদ্যুৎ, প্রাকৃতিক গ্যাস ও জ্বালানি তেলের বাজারে চুক্তিভিত্তিক লেনদেন। এখন প্রচলিত এ বিনিয়োগের বাইরেও মূল পণ্যবাজারে ব্যবসা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিচ্ছে সংস্থাগুলো। অবশ্য এটি হেজ ফান্ডগুলোকে নতুন ধরনের ঝুঁকিতে ফেলতে পারে বলেও অভিমত অনেকের। খবর এফটি।
বৈশ্বিক পণ্যবাজারে কয়েক দশক ধরে আধিপত্য বিস্তার করছে ট্রাফিগুরা ও ভিটোলের মতো প্রতিষ্ঠিত সংস্থা। তাদের কাছে রয়েছে বাজার পূর্বাভাস দেয়ার মতো কয়েক দশকের অভিজ্ঞতা ও তথ্যভাণ্ডার। অন্যদিকে বালিয়াসনি, জেইন গ্লোবাল ও কিউবের মতো হেজ ফান্ড এবং ট্রেডিং ফার্ম জেন স্ট্রিটের রয়েছে চুক্তিভিত্তিক লেনদেনের দীর্ঘ ইতিহাস। এখন মূল পণ্যবাজারে প্রবেশের মাধ্যমে হেজ ফান্ডগুলোর নতুন অভিজ্ঞতা হচ্ছে। পণ্য দামের ওঠানামা আগেভাগে বুঝতে পারছে এবং সে অনুযায়ী দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারছে।
হেজ ফান্ডগুলোর সম্প্রসারিত কার্যক্রমের মধ্যে থাকছে প্রাকৃতিক গ্যাস পাইপলাইনে পরিবহন, অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের জন্য স্টোরেজ ক্ষমতা কিংবা উন্নত ব্যাটারিতে বিদ্যুৎ সংরক্ষণ করে চাহিদার শীর্ষ সময়ে তা বিক্রির সুযোগ। অর্থাৎ তারা কেনা-বেচার সময় শুধু দাম দেখছে না, বরং বাজারে আসলে কী ঘটছে তা আগেভাগেই বুঝতে পারছে।
জ্বালানি ও শিল্প খাতে কেন্দ্রীভূত হেজ ফান্ড গ্যালো পার্টনার্সের প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা মাইকেল আলফারো বলেন, ‘আপনি যখন বাস্তব পণ্যের ওপর লেনদেন করেন, তখন অনেক ভেতরের তথ্য আপনার হাতে আসে এবং সরকারি ডাটা প্রকাশের আগেই অর্থনৈতিক পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যায়।’
মাল্টি-ম্যানেজার হেজ ফান্ড বালিয়াসনি ইউরোপে বিদ্যুৎ খাতে কর্মী ও গবেষণা সক্ষমতা বাড়িয়েছে। দলে সেন্ট্রিকা ও নরলিসের মতো পরিষেবা কোম্পানি থেকে জনবল নিয়োগ করেছে এবং প্রাকৃতিক গ্যাস ট্রেডারও যুক্ত করেছে সংস্থাটি।
মাল্টি-স্ট্র্যাটেজি হেজ ফান্ড জেইন গ্লোবাল চলতি বছর প্রাকৃতিক গ্যাস পরিষেবায় বিশেষায়িত কোম্পানি আনাহাউ এনার্জি কিনে নিয়েছে। অন্যদিকে কোয়ান্টিটেটিভ হেজ ফান্ড কিউবের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ভোল্টার মাধ্যমে সরাসরি ইউরোপের বিদ্যুৎ বাজারে প্রবেশ করেছে। সম্প্রতি পরামর্শক গোষ্ঠী নিইপুলের সদস্য হওয়ার আবেদনও করেছে ভোল্টা। লিংকডইন প্রোফাইল বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের পর থেকে অন্তত নয়জন প্রাকৃতিক গ্যাস ও বিদ্যুৎ ট্রেডার কিউবে যোগ দিয়েছেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, হেজ ফান্ডগুলোর মূল পণ্যবাজারে আগ্রহের পেছনে কিছুটা হলেও ট্রাফিগুরা ও ভিটোলের অবদান রয়েছে। কারণ এ ট্রেডিং ফার্মগুলো বিপুল মুনাফা করে। ২০২২ সালে সিটাডেল হেজ ফান্ডও মূল পণ্যবাজার থেকে বড় অংকের রিটার্ন অর্জন করেছিল। ইউরোপে প্রাকৃতিক গ্যাসের দামে চরম অস্থিরতা তৈরি হলে শীর্ষ ট্রেডাররা বড় অংকের মুনাফা পায়।
সিটাডেল দীর্ঘদিন ধরেই তাদের ট্রেডিং কার্যক্রম সহায়তার জন্য জ্বালানি সম্পদে বিনিয়োগ করে আসছে। তবে চলতি বছর প্রতিষ্ঠানটি চুক্তি ও অধিগ্রহণে বিশেষভাবে সক্রিয়। মার্চে তারা লুইজিয়ানার পালোমা গ্যাস ক্ষেত্র কিনতে ১২০ কোটি ডলার খরচ করেছে। অক্টোবরে কিনে নিয়েছে জার্মান এনার্জি ট্রেডার ফ্লেক্স পাওয়ার। সর্বশেষ সিটাডেলের সহযোগী প্রতিষ্ঠান আপেক্স ন্যাচারাল গ্যাস দুটি পৃথক চুক্তিতে টেক্সাসের হেইনসভিল বেসিনে প্রাকৃতিক গ্যাস সম্পদ কিনতে সম্মত হয়েছে।
২০২২ সালে বৈশ্বিক জ্বালানি তেল ও গ্যাসের বাজার ছিল অস্থির। ওই সময় দামের ওঠানামার কারণে হেজ ফান্ড ও ট্রেডিং ফার্মগুলো বেশ ঝুঁকিতে ছিল। সে তুলনায় চলতি বছর দামের ওঠানামা কম। এছাড়া মূল পণ্যবাজারে প্রবেশ তাদের বিনিয়োগকে বৈচিত্র্যময় এবং নতুন মুনাফা নিশ্চিত করছে।
মূল ট্রেডাররা উন্নত আবহাওয়া পূর্বাভাস ও অন্যান্য ডাটা ব্যবহার করে চাহিদার হঠাৎ বৃদ্ধির সুবিধা নিতে পারে। এখন একই বাজারে প্রবেশের কারণে হেজ ফান্ডগুলো আগেভাগেই পরিস্থিতি আঁচ করতে সক্ষম। একটি বড় হেজ ফান্ডের নির্বাহী বলেন, ‘বিদ্যুতের বাজার হেজ ফান্ডগুলোর জন্য বিশেষভাবে আকর্ষণীয়। কারণ বিশ্লেষণী কৌশল ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্য ও ইউরোপীয় দেশগুলোর বিদ্যুৎ চাহিদা আগাম অনুমান করা যায়।’
এছাড়া দাম কম থাকলে বাড়ার অপেক্ষায় হেজ ফান্ডগুলো এখন পণ্য ধরেও রাখতে পারে। পেন্টাথলন ইনভেস্টমেন্টসের ব্যবস্থাপনা অংশীদার ইলিয়া বুশুয়েভ বলেন, ‘আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেরা ব্যাটারি কাঠামোর মালিক হওয়ার তুলনায় ব্যাটারি লিজ নেয়া বা বিকল্প চুক্তিতে যেতে বেশি আগ্রহী। এটা অনেকটা জ্বালানি তেলের স্টোরেজ ব্যবসার মতো, যা দশকের পর দশক ধরে চলে আসছে। ব্যাটারি আসলে স্টোরেজেরই নতুন রূপ।’
অবশ্য কিছু বিশ্লেষক বলছেন, এ প্রক্রিয়ায় প্রচলিত দক্ষতার বাইরে গিয়ে হেজ ফান্ডগুলোকে নতুন ধরনের ঝুঁকি নিতে হচ্ছে। যেমন ২০০০ দশকের কনভার্টিবল বন্ডে বিনিয়োগ থেকে সরে এসে প্রাকৃতিক গ্যাসে বিনিয়োগ ধরে আমারান্থ। তখন বিনিয়োগকারীদের ৭৫০ কোটি ডলারের মূলধনের প্রায় ৩৫ শতাংশ হারায় প্রতিষ্ঠানটি। তবে আর্থিক ডেরিভেটিভ চুক্তির মাধ্যমে এসব লেনদেন পরিচালিত হয়েছিল।
বিষয়টি সামনে রেখে এক কোয়ান্টিটেটিভ হেজ ফান্ড কর্মকর্তা প্রশ্ন তোলেন, ‘বড় কমোডিটি ট্রেডিং হাউজগুলোর বিশাল ব্যালান্স শিট রয়েছে। তারা পরিবহন থেকে শুরু করে পরিশোধন পর্যন্ত পুরো লজিস্টিকস সরবরাহ চেইন নিয়ন্ত্রণ করে। এ সরবরাহ চেইন থেকেই তারা বিপুল মূল্যবান তথ্য আহরণ করতে পারে।’